Connect with us

বায়োগ্রাফি

ফিলিপ হিউজ: ২২ গজে অপরাজিত থেকে জীবন যুদ্ধে হেরে যাওয়া এক ক্রিকেটারের গল্প

Getty Image

২৬ তম জন্মদিন উদযাপনের ঠিক তিন দিন আগে পরকালে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়া টেস্ট ও ওডিআই জাতীয় দলের ওপেনার ফিলিপ জোয়েল হিউজ। ঘরোয়া লিগের ম্যাচ খেলা কালীন সময়ে মাথায় বলের আঘাত লাগলে সাথে সাথে মাঠেই মুখ থুবড়ে পরে যান তিনি। মাঠে কিছুক্ষণ সেবা দেওয়ার পর নিয়ে যাওয়া হয় সিডনির সেন্ট ভিনসেন্ট হাসপাতালে।

অজ্ঞান অবস্থায় ফিলিপ হিউজ; Image Source: Getty image

করা হয় ৯০ মিনিটের অস্ত্রপাচার। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। দুই দিন কোমায় থেকে হাসপাতালেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন হিউজ। তার মৃত্যুতে শোকাভিভূত হয়েছিল পুরো ক্রিকেট বিশ্ব। অস্ট্রেলিয়া হারায় তার উজ্জ্বল এক নক্ষত্রকে।

জন্ম

১৯৮৮ সালের ৩০ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের উত্তর উপকূলের শহর ম্যাকসভিলে বাবা গ্রেগ ও মাতা ভার্জিনিয়ার ঘরে জন্ম গ্রহন করেন হিউজ। তার বাবা পেশায় একজন কলা খামারি এবং মা একজন ইতালিয়।

ক্রিকেটীয় ক্যারিয়ার

১৬ বছর বয়সে ক্রিকেটীয় ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করতে অনেক প্রত্যাশা নিয়ে সিডনি পাড়ি জমান হিউজ। অল্প সময়েই প্রত্যাশা অনুযায়ী সফলতা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়েও ছিলেন অনেক। বামহাতি ব্যাটিং ও উইকেটরক্ষকের ভুমিকায় দেখা যেত তাকে। ২০০৭ সালের নভেম্বরে নিউ সাউথ ওয়েলসের হয়ে তাসমানিয়ার বিপক্ষে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। অভিষেক ম্যাচ ইনিংস ব্যবধানে জয় পায় তার দল।

ফিলিপ হিউজ; Image Source: espncricinfo

সে বছর নিউ সাউথ ওয়েলসের রাইজিং সুপার স্টারের পুরষ্কার জেতেন হিউজ। মাত্র ১৯ বছর বয়সে শেফিল্ড শিল্ডের ফাইনালে সর্বকনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে শতক পূর্ণ করেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। ২০০৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট স্কোয়াডে ডাক পান তিনি। ২০০৯ সালে তিনি ব্রাডম্যান ইয়ং ক্রিকেটার অব দ্য ইয়ার এবং শেফিল্ড শিল্ড প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার পুরষ্কার জেতেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরুটা হয়েছিল শূন্য দিয়ে। ২০০৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে এক টেস্ট সিরিজে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ম্যাথু হেইডেনের পরিবর্তে মাত্র ২০ বছর বয়সেই দলে জায়গা মিলেছিল এই অজি ওপেনারের। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শুরুটা একেবারেই মনের মতো হয়নি। অভিষেক ম্যাচে ইনিংসের চতুর্থ বলেই ডেইল স্টেইনের পেসের কাছে পরাস্ত হয়ে সাজঘরে ফিরে যেতে হয় হিউজকে।

ফিলিপ হিউজ; Image Source: espncricinfo

তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে যার একচ্ছত্র বিচরণ সে কি এতো সহজে দমবার পাত্র। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসেই নিজের জাত চেনালেন তিনি। ১১ চার আর ১ ছয়ে ৭৫ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস উপহার দিলেন সবাইকে। তবে এখনো  চমক শেষ হয়নি।

সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসেই ১১৫ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস খেলে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ানের খাতায় নাম লিখান হিউজ। তবে এতেই থামেনি হিউজের চমক। ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসেই ১৬০ রানের ইনিংস খেলে বিশ্ব রেকর্ডে ভাগ বসান ২০ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান।

ফিলিপ হিউজ; Image Source: espncricinfo

ভাঙেন জর্জ হেডলির ৭৯ বছরের রেকর্ড। বনে যান এক ম্যাচের দুই ইনিংসেই শতকের দেখা পাওয়া সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার। এখন পর্যন্ত হিউজই বিশ্বের সবথেকে তরূণ ব্যাটসম্যান যে কি না একই টেস্টের দুই ইনিংসেই শতক হাঁকিয়েছেন।

টেস্টের দুর্দান্ত সূচনার চার বছর পর ওয়ানডে অভিষেকেও সেই চিরচেনা হিউজকেই দেখে ক্রিকেটবিশ্ব। ২০১৩ সালের ১১ জানুয়ারি শ্রীলংকার বিপক্ষেও শতক হাঁকিয়ে শুরু করেন তার ওয়ানডের পথচলা। এই শতকের ফলে হিউজ হয়ে ওঠে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের সর্বপ্রথম ব্যাটসম্যান যে কিনা ওয়ানডে অভিষেকে শতক দিয়ে ক্যারিয়ারের সূচনা করেছেন। ২০১২/১৩ মৌসুমে ডোমেস্টিক প্লেয়ার অব দ্য ইয়ার পুরষ্কার জেতেন।

ফিলিপ হিউজ; Image Source: cricketaustralia

২০১৪ সালের জুলাইতে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ‘লিস্ট এ’ তে ডাবল সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন হিউজ। তার একমাস পর তিনি ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস খেলেন। ছিলেন ২৪৩ রানে অপরাজিত।

টেস্ট ক্যারিয়ার

হিউজ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ২৬টি টেস্ট ম্যাচ খেলেন। যাতে ৪৯ ইনিংস ব্যাট করে ৩২.৬৫ গড়ে ১৫৩৫ রান করেন। শতক পূর্ণ করেন ৩টি এবং অর্ধশতক ৭টি। টেস্টে সর্বোচ্চ ব্যাক্তিগত রানের ইনিংসটি ছিল ১৬০ রানের, যা তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করেন। তিন শতকের দুইটি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে করলেও অন্যটি করেন শ্রীলঙ্কা বিপক্ষে ২০১১ সালে কলম্বোতে। ১৮ জুলাই ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে শেষ টেস্ট খেলেন হিউজিসী।

ওডিআই ক্যারিয়ার

২০১৩ সালের ১১ জানুয়ারি শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় হিউজের। সে বছরই ২ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে শেষ ওডিআই খেলেন এই উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান। খেলেছেন ২৫টি ম্যাচ। ব্যাট করেছেন ২৪ ইনিংস। ৩৫.৯১ গড়ে করেছেন ৮২৬ রান। শতক হাকিয়েছেন ২টি অর্ধশতক ৪টি। ক্যারিয়ারের প্রথম সিরিজে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ও শেষ ম্যাচে শতক তুলে নেন তিনি। সর্বোচ্চ রানের ইংসটিতে করেছিলেন ১৩৮, ছিলেন অপরাজিত।

ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ার

হিউজ ১১৪টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলেন। যাতে ২০৯ ইনিংস ব্যাট করে ৪৬.৫১ গড়ে করেছেন ৯০২৩ রান। শতক পূর্ণ করেন ২৬টি আর অর্ধশতক ৪৬টি। সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটিতে ছিলেন অপরাজিত। করেন ২৪৩ রান।

লিস্ট ‘এ’ ক্যারিয়ার

৯১টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচের ৮৯ ইনিংস ব্যাট করেন ফিলিপ। ৪৭.২৫ গড়ে করেন ৩৬৩৯ রান। শতক পূর্ণ করেন ৮টি ও অর্ধশতক ২৩টি। এখানেও সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটিতে ছিলেন অপরাজিত, করেন ২০২ রান।

টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ার

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে ১টি ম্যাচ খেললেও ক্যারিয়ারে মোট ৩৪টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেন হিউজ। ৪২.৬৯ গড়ে করেন ১১১০ রান। রয়েছে ১০টি অর্ধশতক। সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটিতে করেন ৮৭ রান, ছিলেন অপরাজিত।

৬৩ রানে অপরাজিত ছিলেন হিউজ; Image Source: sportingbd

হিউজ ঘরোয়া লিগে ২০০৭-১২ পর্যন্ত নিউ সাউথ ওয়েলস, ২০০৯ মিডলসেক্স, ২০১০ হ্যাম্পশায়ার, ২০১১-১২ সিডনি থান্ডার, ২০১২ ওরচেস্টারশায়ার, ২০১৩-১৪ দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া ও ২০১৩ সালে মুম্বাই ইন্ডিয়ানসের হয়ে খেলেন।

‘দ্য কিড’ নামেই ক্রিকেট মহলে পরিচিত ছিলেন হিউজ। কেউ কেউ আবার হিউজিসী বলেও ডাকতেন। তবে ডেভিড ওয়ার্নার আদর করে ডাকতেন ‘লিটল মেট’।

চিরবিদায় হিউজ!

২০১৪ সালের ২৫ নভেম্বরে নিজের ঘরের মাঠে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডে শেফিল্ড শিল্ড ম্যাচে মুখোমুখি হয় সাউথ অস্ট্রেলিয়া এবং নিউ সাউথ ওয়েলস। দুই দলের মধ্যকার ম্যাচে ব্যাট করছিলেন সাউথ অস্ট্রেলিয়ার টপঅর্ডার ব্যাটসম্যান হিউজ। দারুন ছন্দে দিনটি শুরু করে ছিলেন হিউজ। দল দ্রুত উইকেট হারাতে থাকলেও এক পান্ত আগলে খেলতে থাকেন হিউজ। ব্যাট করছিলেন তখন ১৬১ বলে ৬৩ রানে অপরাজিত থেকে।

শন অ্যাবোটের দেওয়া বাউন্ডারের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পরেন হিউজ; Image Source: getty image

চলছিল ৪৯ তম ওভারের খেলা। নিউ সাউথ ওয়েলসের পেসার শিন অ্যাবোট এগিয়ে আসছিলেন তার ওভারের ৩য় নাম্বার বলটি করার জন্য। তার দেওয়ার ডেলিভারিটি ছিল বাউন্সার। বলটি পুল করতে গিয়ে ব্যর্থ হন হিউজ। ফলে বলটি সরাসরি হিউজের হেলমেটের নিচ দিয়ে কানের ঠিক নিচে লাগে। এ সময় তিনি মাটিতে পড়ে গেলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন না হলে তাকে দ্রুত তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

কফিনে হিউজের নিথর দেহ; Image Source: espncricinfo

এর দুই দিন পর ২৭ নভেম্বর হাসপাতালের বিছানায় কোমায় থেকেই পৃথিবীকে বিদায় জানান সদাহাস্য এই তরুন। পরে মেডিকেলের ভাষায় জানানো হয়, বলটি হিউজের মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ করা ধমনীতে আঘাত করলে সেই ধমনী ছিন্ন হয়ে যায় (vertebral artery dissection)। এরফলে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বন্ধ হয়ে ব্রেইন হ্যামারেজে মৃত্যু হয় তার।

জীবনের শেষ ইনিংসে অপরাজিত থাকা অসমসাহসী ফিলিপ হিউজের বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা! ক্রিকেট আপনাকে কখনো ভুলবে না হিউজ!

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More in বায়োগ্রাফি