Connect with us

ক্রিকেট

ক্রিকেট নিয়ে হিটলারের গল্পটি সত্য নাকি মিথ্যা?

অ্যাডলফ হিটলার, পৃথিবী জুড়ে অধিকাংশ মানুষের কাছে তিনি খলনায়ক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিজ দেশের ইহুদী নিধন এবং ইউরোপে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর জন্য তিনি কুখ্যাতি অর্জন করেছেন। হিটলার নিজে কোনো খেলাধুলার সাথে জড়িত ছিলেন কিনা সে বিষয়ে জানা যায়নি। তবে ক্রিকেটের সাথে তার একটি গল্প বহুলভাবে প্রচলিত। বিশ্বজুড়ে ধারণা জার্মানির ক্রিকেট না খেলার পেছনে হিটলারের হাত রয়েছে। তিনিই জার্মানিতে ক্রিকেট নিষিদ্ধ করেছেন। এই নিয়ে যে গল্পটি প্রচলিত সেটা প্রায় সবারই জানা। কিন্তু অধিকাংশ মানুষই লোকমুখে শোনা এই গল্পের সত্যতা যাচাই করেননি। বরং ফুটবল পাগল জার্মানিতে ক্রিকেট না খেলার পেছনে সবসময় হিটলারকে দায়ী করা হয়েছে।

অ্যাডলফ হিটলার; Image Source: historyonthenet.com

কিন্তু এই বিষয়ে বিস্তর গবেষণার পর ভিন্ন এক তথ্য উঠে এসেছে। জার্মানির ক্রিকেট নিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে দুইটি বই প্রকাশ হয়। এর একটি ছিল ড্যান ওয়াডেলের ‘ফিল্ড অব শ্যাডোস’
এবং অপরটি বিবিসির ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্সের ব্রডকাস্টার জন সিম্পসনের ‘আনরিলাইয়েবল সোর্স’। জার্মানিতে নাৎসি যুগে ক্রিকেটের বেশ কিছু ঘটনা উঠে এসেছে এই বইতে।

জার্মানি সফরে ইংলিশ ক্রিকেট দল

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই বছর আগে বার্লিন সফরে যায় জেন্টলমেন অব ওরচেস্টারশায়ার ক্রিকেট ক্লাব। মূলত নাৎসি সরকারের আমন্ত্রণেই তারা জার্মানি সফরে যায়। এর আগে ১৯৩৭ সালে উইম্বলডনে ডেভিস কাপের সেমিফাইনালে যুক্তরাষ্ট্র বনাম জার্মানির ম্যাচটি দেখার জন্য ইংল্যান্ড সফরে আসেন জার্মানির নাৎসি সরকারের রাইকস্পোর্টস ফুয়েরার (ক্রীড়া মন্ত্রী) হ্যান্স ভন চ্যামার। একই সময়ে তাকে লর্ডসে ইংল্যান্ডের গ্রীষ্মকালীন স্পোর্টস ইভেন্ট দেখার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে ভন চ্যামার মিডলসেক্স বনাম ওরচেস্টারশায়ারের মধ্যকার একটি ক্রিকেট ম্যাচ দেখেন।

ম্যাচ চলাকালীন সময়ে ভন চ্যামার ওরচেস্টারশায়ারের সাবেক খেলোয়াড় ও ক্লাব নেতৃত্বের অন্যতম সদস্য ম্যাজ মাওরিস জুয়েলের সাথে সাক্ষাৎ করেন। তখন তিনি জুয়েলকে তার দল নিয়ে বার্লিন সফরে যাওয়ার অনুরোধ করেন। জেন্টলমেন অব ওরচেস্টারশায়ার সেই সময়ের অন্যতম পুরনো ক্লাব। ১৮৪৮ সালে তারা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করে।

বার্লিন সফরে যাওয়া ওরচেস্টারশায়ার দল; Image Source: BBC

নাৎসি মন্ত্রীর অনুরোধের পর জুয়েল তার দল নিয়ে ১৯৩৭ সালের আগস্টে বার্লিন সফরে যায়। সেখানে পৌঁছানোর সাথে সাথে তাদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হয়। এবং নাৎসিদের প্রতীক স্বস্তিকা চিহ্ন যুক্ত গাড়ীতে করে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওরচেস্টারশায়ারের এই সফর জার্মানির সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব পায়। এবং তাদের সব খবরাখবর গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ করা হয়।

জার্মানির পত্রিকায় সেই সফরের খবর; Image Source: BBC

জুয়েলের নেতৃত্বাধীন ওরচেস্টারশায়ার তিন ম্যাচ সিরিজের সবগুলো ম্যাচেই জার্মানিকে অনায়াসে হারায়। ইংলিশদের বিপক্ষে জার্মানি তাদের সেরা খেলোয়াড় অ্যালবার্ট শিমিটকে খেলায়নি। কারণ শিমিট ছিলেন ইহুদী। সেই সময় মাঠের পরিস্থিতি ভালো হলেও মাঠের বাইরের পরিস্থিতি ছিল খুবই ভয়ঙ্কর। ওরচেস্টারশায়ার যখন বার্লিনে পৌঁছায়। তখন শহরটির ৭০০তম বর্ষপূর্তি উদযাপিত হচ্ছিল। তখন নাৎসি সরকার তাদের শক্তিমত্তা দেখানোর জন্য ভারী অস্ত্রসস্ত্রসহ সৈন্যদের একাধিক প্যারেড করায়। যা ইংলিশ ক্রিকেটারদের জন্য ছিল বড় উদ্বেগের কারণ। সিরিজ শেষে তারা দ্রুত জার্মানি ত্যাগ করে দেশে ফিরে আসে।

ক্রিকেট প্রেমী হিটলার

জন সিম্পসন তার ‘আনরিলাইয়েবল সোর্স’ বইতে ক্রিকেটের প্রতি হিটলারের ভালোবাসা তুলে ধরেছেন। তিনি তার বইতে ১৯৩০ সালে ডেইলি মেইলে তৎকালীন ডানপন্থী ব্রিটিশ এমপি অলিভার লকার-ল্যাম্পসনের একটি প্রবন্ধ তুলে ধরেছেন। ল্যাম্পসন ছিলেন হিটলারের ঘনিষ্ঠ এবং একনিষ্ঠ সমর্থক। তিনি ‘অ্যাডলফ হিটলার অ্যাজ আই নো হিম’ শিরোনামে প্রবন্ধটি লেখেন, যা ১৯৩০ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি হিটলারের ক্রিকেট প্রেম সম্পর্কে তুলে ধরেন।

সেই সময়ের বার্লিন; Image Source: BBC

ল্যাম্পসনের তথ্য মতে, হিটলার প্রথমে ক্রিকেটকে তার সেনাদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। হিটলার তখন জার্মান সেনাবাহিনীতে ল্যান্স করপোরাল হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি একবার এক হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। সেই হাসপাতালের পাশে কিছু ছেলেকে তিনি ক্রিকেট খেলতে দেখেন। ক্রিকেট তার কাছে একেবারেই নতুন ছিল এবং তিনি আগে কখনো দেশের অন্য কোথাও খেলতে দেখেননি। হিটলার তখন সেই ছেলেদের কাছে ক্রিকেট সম্পর্কে জানতে চান। তখন সেই ছেলেরা হিটলারকে ক্রিকেটের নিয়মকানুন লিখে দেয়।

জার্মানদের সাথে ওরচেস্টারশায়ারের ক্রিকেট ম্যাচের একটি মুহুর্ত; Image Source: BBC

পরবর্তীতে তিনি সেই ছেলেদের সাথে একটি ক্রিকেট ম্যাচ খেলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ম্যাচে হিটলার শূন্য রানে আউট হন। খেলাশেষে তিনি ক্রিকেটকে জার্মান ফ্যাসিবাদের জন্য খুব বেশি আক্রমণাত্মক নয় বলে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে হিটলার ক্রিকেটের নিয়মকানুন নিয়ে বেশ গবেষণা করেন। এবং তিনি ক্রিকেটের বেশ কিছু নিয়ম পরিবর্তনেন প্রস্তাব করেন। কিন্তু সেই সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত জার্মানিতে ক্রিকেট জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি।

ফুটবল পাগল জার্মানরা ক্রিকেটকে কখনোই গ্রহণ করেনি। এমনকি জার্মানি আজ থেকে ২৮ বছর আগে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সদস্য হলেও এখনো জার্মানিতে ক্রিকেট জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। তবে ক্রিকেট নিয়ে হিটলারের যে গল্পটি প্রচলিত সেটি পুরোপুরি মিথ্যা। কেননা হিটলার অনেক মানুষ হত্যা করেছেন। কিন্তু কোনো ক্রিকেটারকে হত্যা করেছেন বলে শোনা যায়নি।

Featured Image Source: AP

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More in ক্রিকেট