Connect with us

ক্রিকেট

সাকিব আল হাসান: সৎ থেকে লড়ছেন গোটা সিস্টেমের বিরুদ্ধে

রগচটা ছেলে, বেয়াদপ, জেদী এইসব তকমা পাওয়া ছেলেটা আজ বাংলাদেশ ক্রিকেটের জান। দলে তার থাকা না থাকায় গ্যালারিতে যেমন দর্শকের উপস্থিতি পাল্টে যায় তেমনি তার উপস্থিতিতে পাল্টে যায় যে কোন ম্যাচের গতিপথ।

সাকিন আল হাসান; Dailystar

চারদিনে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে পরাজয়, তিন দিনে ইংল্যান্ডকে নাস্তানাবুদ করে ১০৮ রানের জয় সব কি সম্ভব হতো সাকিবকে ছাড়া? সাকিবকে ছাড়া কি কোন সিরিজ কল্পনা করা যায়? তার অনুপস্থিতি কি মেনে নেওয়ার মতো? বাংলার ক্রিকেটের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সাকিব।

আজ থেকে প্রায় এগারো বছর আগেই সাকিবকে জুয়াড়িরা ম্যাচ ফিক্সিং-এর প্রস্তাব দিয়েছিল। সাল ২০০৮, মার্চ। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের আগে জুয়াড়িরা সাকিবকে ফিক্সিং এর বিনিময়ে ‘স্পন্সরশিপ’ পাইয়ে দেয়ার লোভ দেখিয়েছিল।

সাকিব আল হাসান; icc

সাকিবের বয়স তখন খুবই কম, মাত্র বাইশ বছর। কেবলই নিজেকে মেলে ধরছেন, নিজের জাত চেনাতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনি জুয়াড়িদের কু দৃষ্টিতে সাকিব ধরা পড়ে। ওরা বুঝতে পারছিল, এলোমেলো মিষ্টি দুষ্ট হাসির এই তরুণের ভেতর বারুদ আছে। জুয়াড়িরা সেই বারুদ নিয়েই খেলতে চেয়েছিল অত্যন্ত লোভনীয় প্রস্তাবের বিনিময়ে।

মনে রাখা উচিৎ সাকিব তখনও দ্যা মাইটি সাকিব আল হাসান হয়ে উঠেনি, মাত্রই খেলা শুরু করেছে, বাংলাদেশের ক্রিকেটও তখন এখনকার মতো আহামরি কোন পজিশনে নেই। মাগুরার প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ পরিবারের সাকিবের পক্ষে কিন্তু খুব সহজ ছিল ক্যারিয়ারের শুরুতেই সেই লোভনীয় আকর্ষণীয় প্রস্তাবে রাজি হয়ে ব্যক্তি ক্যারিয়ার সিকিউর করে গুছিয়ে নেয়া।

বাইশ বছরের তরুণ সাকিব সেদিন এক মুহুর্ত চিন্তা না করেই ফিরিয়ে দিয়েছিল জুয়াড়িদের। পা ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল লক্ষ কোটি টাকার অফার। সাকিব দেশের জন্য খেলে গেল। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশ সে বার সিরিজ জয় করল। সাকিব হয়ে উঠতে লাগল দ্য সাকিব আল হাসান। ২০১৫ সালে বিশ্বের প্রথম এবং একমাত্র ক্রিকেটার হিসেবে আইসিসি সাকিবকে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে ‘নাম্বার ওয়ান অলরাউন্ডার’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করল।

২০১৯ এর জুনে, সাকিব আল হাসান অর্জন করল দ্রুততম খেলোয়াড়ের খেতাব যিনি মাত্র ১৯৯ ম্যাচ খেলে ছয় হাজার রান এবং দুশ পঞ্চাশ উইকেট পেয়েছে। সাকিব আল হাসানই একমাত্র প্লেয়ার যিনি ক্রিকেট বিশ্বকাপে একইসাথে ১০০০ রান এবং ৩০ উইকেট লাভ করবার গৌরব অর্জন করতে পেরেছে।

এতো এতো যার অর্জন, সেই সাকিব আল হাসান সর্বশেষ নিজের ব্যক্তি স্বার্থের কথা না ভেবে শুধুমাত্র দেশের ক্রিকেটের জন্য সর্বস্তরের ক্রিকেটারদের নিয়ে সামনে থেকে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে মহাক্ষমতাধর বিসিবি থেকে তেরো দফা দাবীর পক্ষে পজেটিভ রেজাল্ট নিয়ে এসেছে।

মিরপুরে ক্রিকেটারদের ধর্মঘটে সাকিব আল হাসান; Pakistantoday

ক্রিকেটে সাকিব আল হাসানের যাত্রা রূপকথার মতো। সাকিব আল হাসান কেবল ছোট দলের বড় তারকাই নয়, সামগ্রিক বাংলাদেশের প্রাণভোমরা সাকিব আল হাসান।

দুই বছর আগে জুয়াড়িরা আবারও সাকিবকে প্রস্তাব পাঠায়। সাকিবের মতো বিশ্বসেরা খেলোয়াড়কে বশ করতে নিশ্চয়ই বিনিময়ের অংকটা ছিল বিশাল। আমাদের সাকিব এবারও সেই ম্যাচ ফিক্সিং- প্রস্তাব তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। তবে একটা ছোট ভুল করে, গতবারের মতো তিনি আইসিসিকে বিষয়টি জানাননি। হয়তো প্রয়োজনই মনে করেনি। তুমুল প্রতিভাবান আর অমানুষিক পরিশ্রমী এক ক্রিকেটারের। খামখেয়ালী ছাড়া এ আর কিছুই নয়।

সাকিব আল হাসান; Icc

গত এক বছর ধরেই সাকিব জানতেন তার নামে অভিযোগ চলছে, মাথায় এতবড় দুশ্চিন্তা নিয়েও সাকিব আল হাসান কিন্তু বিশ্বকাপ বাংলাদেশের পক্ষে এমনকি সমস্ত ক্রিকেট দলগুলোর মাঝে অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিল, মাত্র ছয় ম্যাচ খেলেই ৫০০ রান এবং দশ উইকেট নিয়ে ছিলেন ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের যোগ্য দাবিদার।

২০১৯ বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসানের জেতা ম্যান অব দ্য ম্যাচ ট্রফি; espncricinfo

কতোটা মানসিক শক্তি থাকলে একজন মানুষ এতো কঠিন সময়েও এতো সেরা পারফর্মেন্স করতে পারে! হয়তো কোটি ক্রিকেট প্রেমীর জান বলেই এইটা পেরেছেন সাকিব আল হাসান।

বাংলাদেশের ছেলে বিশ্বজয় করে চলছে, আমরা জানি না পিছনে কোন লোকাল, আন্তর্জাতিক কন্সপিরেসি চলছে কি না। সাকিব ম্যাচ ফিক্স করেনি, সাকিব ফিক্সিং – যুক্ত না। সাকিব বরাবরের মতো এবারও সৎ থেকে জুয়াড়িদের অফার ফিরিয়ে দিয়েছিল। কিছুটা খামখেয়ালী তার ছিল, কিন্তু বিশ্ব জেনে রাখুক আমাদের সাকিব অন্যায় করেনি।

২০১১ বিশ্বকাপে সাকিব আল হাসান; espncricinfo

আইসিসির দুর্নীতি দমন নীতিমালার ২.৪.৪ ধারা অনুসারে কেউ যদি আইসিসির অ্যান্টিকরাপশন কোডের অধীন কোনো দুর্নীতিতে জড়ানোর প্রস্তাব পায় এবং তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণী আইসিসিকে অনতিবিলম্বে জানাতে ব্যর্থ হয় তার সর্বনিম্ন ৬ মাস এবং সর্বোচ্চ ৫ বছর নিষেধাজ্ঞা বহনের শাস্তি হতে পারে।

ভক্তের ভালবাসায় সিক্ত সাকিব; bcb

বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে গুঞ্জন উঠেছে আইসিসিকে অবগত না করায় ১৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা আসতে যাচ্ছে সাকিবের উপর। কিন্তু বাংলার ক্রিকেট প্রেমীরা তা কখনোই মেনে নিতে পারবে না। তবে সাকিব যদি আপিল করেন সে সাজা কমতে পারে। কিন্তু আমরা চাই যেন আমাদের সাকিবকে সর্বনিম্ন সাজাটাই দেওয়া হয়।

সাকিব আল হাসান; icc

বাংলাদেশের সামনে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ। সাকিব বিহীন বাংলাদেশ কেমন হবে? ভাবতেই গা শিউরে উঠে। দ্রুত এই সমস্যার নিষ্পত্তি হোক। সাকিব! সাকিব বলে শহরে, বন্দরে, রাস্তায়, ফতুল্লা, মিরপুর, সিলেট কিংবা চট্টলায়, তারই জয় গান অবিরত শুনতে চায় এই ক্রিকেট পাগল জাতি।

বাংলার ক্রিকেটের জান, মান, ভালোবাসার আরেক নাম সাকিব আল হাসান।

Featured Image: icc

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More in ক্রিকেট