Connect with us

ক্রিকেট

২০১৯ সালে ক্রিকেটে ঘটে যাওয়া যত স্মরণীয় ঘটনা

ICC

২০১৯ সাল। ক্রিকেট প্রেমীদের জন্য অনেক স্মৃতিময় একটি বছর ছিল। এই বছর বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো কোন ত্রিদেশীয় সিরজ জয় লাভ করে, শ্রীলঙ্কানরা দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম এশিয়ান দল হিসেবে টেস্ট সিরজ জয় লাভ করে, প্রথম বারের মতো ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ জয় লাভ করে, ১৯৭২ সালের পর এই বার অ্যাশেজ শেষ হয় ড্র দিয়ে, বছর জুড়ে ছিল বেন স্টোকস, স্টিভ স্মিথ, ওয়ার্নার, রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি, কুশাল পেরেরা শো। সব মিলিয়ে নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে শেষ হলো বছরটি।

চলুন জেনে নেওয়া যাক এই বছরের কিছু আলোচিত ম্যাচ সম্পর্কে:

বিশ্বকাপে কার্লোস ব্রাথওয়েটের হতাশা

হাতে আছে ৬ বল! প্রয়োজন ১৯ রান! নিতে পারলেই বিশ্বকাপ জয়। ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালের ঘটনা। স্ট্রাইকে থাকা কার্লোস ব্রাথওয়েটের উপর নির্ভর করছিল তখন ক্যারিয়ানদের ভাগ্য। অনেকে তো ভেবেই নিয়েছিলেন শিরোপাটা এই বার ইংলিশদের হাতেই যাচ্ছে।

বেন স্টোকস; Image Source: Icc

কিন্তু ইডেনে সেদিন সবার ভুল ভাঙিয়ে মহা কাব্যিক এক ইনিংস খেলেন ব্রাথওয়েট। বেন স্টোকসকে টানা চারটি ওভার বাউন্ডারি হাঁকিয়ে শিরোপা নিজেদের করেন তিনি তিনি। তখন থেকেই ব্রাথওয়েটের দানবীয় ব্যাটিং সম্পর্কে সবার জানা।

কার্লোস ব্রাথওয়েট; Image Source: Icc

তার সে দানবীয় ব্যাটিং আবারও দেখা মিললো ২০১৯ ওডিআই বিশ্বকাপে। গ্রুপ পর্বের একটি ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২৯২ রানের টার্গেটে পায় ক্যারিয়ানরা। জয়ের আশা নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামলেও টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায় ১৬৪ রানেই ৭ উইকেট হারিয়ে বসে তারা।

কার্লোস ব্রাথওয়েট; Image Source: Icc

দ্বায়িত্বটা নিজের কাঁধেই তুলে নেন ব্রাথওয়েট। দলকে দেখান জয়ের স্বপ্ন। ৮০ বলে ৯ চার আর ৫ ছয়ে তুলে নেন ওডিআই ক্যারিয়ারের প্রথম শতক। দলের সংগ্রহ তখন ছিল ৯ উইকেটে ২৮৬ রান। জয়ের জন্য ৭ বলে প্রয়োজন ছিল ৬ রানের। কিন্তু ৪৯ তম ওভারের শেষ বলে বোল্টের তালু বন্দী হলে সেখানেই ম্যাচ জয়ের স্বপ্নের মাটি চাপা পড়ে যায় ব্রাথওয়েটের। জয়ের খুব কাছাকাছি গিয়েও হার মানতে হয় তাকে।

ওডিআই বিশ্বকাপ ফাইনাল

২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনাল, যা ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম একটি ঐতিহাসিক ম্যাচ। যেখানে কোন দল কোন দলকে পরাপজিত করতে পারেনি। মূল খেলার পর সুপার ওভারেও ম্যাচটি ড্র থাকে। ফলাফল নির্নয় করা হয় বাউন্ডারি হিসেব করে। মূল খেলা কিংবা সুপার ওভার সব জায়গায়ই ছিল স্টোকসময়।

বেন স্টোকস; Image Source: Icc

২৪২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নামা ইংল্যান্ড দল ২৩ ওভারে ৮৬ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে। পঞ্চম উইকেটে জস বাটলার ও স্টোকসের শত রানের জুটিতে জয়ের আশা দেখে ইংলিশরা। কিন্তু শেষ মূহুর্তে বাটলার আউট হয়ে গেলে চাপে পড়ে ইংল্যান্ড। তারপর একে একে ওকস, প্লাঙ্কেট, আর্চারের উইকেট হারায় তারা।

বেন স্টোকস; Image Source: Icc

শেষ ওভারে তাদের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫ রানের। প্রথম দুই বলে কোন রান নিতে না পারলেও পরের দুই বলে দুইটি ওভার বাউন্ডারি হাঁকান স্টোকস। পরের বলে দুই রান নিতে গিয়ে রান আউটের শিকার হন আদিল রাশিদ। শেষ বলে ২ রান প্রয়োজন ছিল ইংল্যান্ডের, স্ট্রাইকে ছিলেন স্টোকস। এক রান নিতে পারলেও অপর প্রান্তে থাকা উড রান আউটের শিকার হন।

বেন স্টোকস; Image Source: Icc

ম্যাচ ড্র অবস্থায় শেষ হয়। ৯৮ বলে ৫ চার ও ২ ছয়ে ৮৪ রানে অপরাজিত থাকেন স্টোকস। ম্যাচ গড়ায় সুপার ওভারে। সেখানেও নাটকীয়তা। আগে ব্যাট করে ইংল্যান্ড ১৫ রান সংগ্রহ করে। তাদের সমান ১৫ রানই করতে পারে কিউইরা। জয় নির্ধারণ করা বাউন্ডারি হিসেবে। যেখানে ২৬টি বাউন্ডারি ছিল ইংল্যান্ডের এবং ১৭টি ছিল ব্ল্যাক ক্যাপসদের।

অ্যাশেজের তৃতীয় টেস্টের নাটকীয়তা

২০১৯ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পরপরই নিজ দেশে অ্যাশেজ খেলতে প্রস্তুত হয়ে পড়ে ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপ যেখানে শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকে শুরু করতে চাইলেও পরিকল্পনা মতো জয় তুলে নিতে ব্যর্থ হয় ইংলিশরা। সিরিজের প্রথম ম্যাচ ২৫১ রানের হার এবং দ্বিতীয় টেস্টে ড্র। ১-০ তে পিছিয়ে থাকা ইংলিশরা সিরিজ সমতায় আনে তৃতীয় ম্যাচে। সেখানে ও জয়ের নায়ক বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পাইয়ে দেওয়া বেন স্টোকস।

বেন স্টোকস; Image Source: Icc

তার ব্যাটিং শৈলীতে হারতে যাওয়া ম্যাচ জিতে নেয় ইংল্যান্ড। তৃতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে মাত্র ৬৭ রানে অলআউট হয় ইংল্যান্ড। ফলে ১১২ রানে এগিয়ে থেকে তৃতীয় ইনিংসে আরও ২৪৬ রান স্কোর বোর্ডে যোগ করে ৩৫৮ রানের টার্গেট দেয় অজিরা। জবাবে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে ইংলিশরা। ব্যাটসম্যানদের আসা যাওয়ার মাঝে এক প্রান্ত আগলে খেলতে থাকেন স্টোকস।

বেন স্টোকস; Image Source: Icc

শেষ উইকেট জুটিতে তার সাথে যোগ দেন জ্যাক লেচ। তখন জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৭৩ রানের। ম্যাচটি অজিরাই জেতবে বলে ধরেই নিয়ে ছিলেন অনেকেই। কিন্তু সে ধারনা পাল্টে যায় জ্যাক লেচ আর স্টোকসের অসাধারণ জুটিতে। ৭৩ রানের মধ্যে ১ রান করেন লিচ আর বাকি রান আসে স্টোকসের ব্যাট থেকে।

বেন স্টোকস; Image Source: Icc

এরই মধ্যে ক্যারিয়ারের ৮ম শতক পূর্ণ করেন স্টোকস। ম্যাচ শেষে ২১৯ বলে ১৩৫ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। ১ উইকেট হাতে রেখে জয় তুলে নেয় স্বাগতিকরা। ম্যাচটিতে বল হাতেও দুর্দান্ত ছিলেন স্টোকস। নিয়েছিলেন ৪ উইকেট। হয়েছিলেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ। ম্যাচটি ছিল এই শতকের অন্যতম একটি স্মরণীয় টেস্ট ম্যাচ।

ডারবানে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কুশাল পেরেরা ব্যাটিং ঝলক এবং এশিয়ানদের দক্ষিণ আফ্রিকা জয়

২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সফর করার আগে তাদের মাটিতে ১৩টি টেস্ট ম্যাচ খেলে শ্রীলঙ্কা। যার ১১টি ম্যাচই হারে সফরকারীরা। জয়ের দেখা পায় ১ ম্যাচে আর ড্র হয় ১টি। ২০১৯ এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে কখনো সিরিজ জেতা হয়নি লঙ্কানদের। শুধু তারাই নয় এশিয়ার কোন দেশই প্রোটিয়াদের মাটিতে এর আগে টেস্ট সিরিজ জয় লাভ করতে পারেনি।

চলতি বছর ফেব্রুয়ারিতে সফরকারী শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই ম্যাচের একটি টেস্ট সিরিজ খেলে দক্ষিণ আফ্রিকা। ডারবানে সিরিজের প্রথম টেস্টে মুখোমুখি হয় দুই দল। ম্যাচটিতে টসে জিতে স্বাগতিকদের ব্যাটিংয়ে পাঠায় লঙ্কানরা। ব্যাটিংয়ে নেমে মাত্র ১৯১ রান তুলতেই সবকয়টি উইকেট হারায় তারা।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে ২৩৫ রানে গুটিয়ে যায় সফরকারীদের ইনিংস। ৪৬ রানে পিছিয়ে থেকে তৃতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ডু প্লেসিসের ৯০ আর ডি ককের ৫৫ রানের উপর ভর করে ২৫৯ রানের পুঁজি পায় আফ্রিকানরা। জয়ের জন্য ৩০৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে শুরুটা দারুন হলেও মাত্র ১১০ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে তারা।

তখনই দলের হাল ধরেন কুশাল পেরেরা ও ডি সিলভা। দুই জনে মিলে ৯৬ রানের জুটি গড়েন, যাতে দলের মোট সংগ্রহ দাঁড়ায় ২০৬ রানের। পরের ২০ রান তুলতেই আরও তিন উইকেট হারিয়ে ৯ উইকেটে দলের সংগ্রহ দাঁড়ায় তখন ২২৬ রান। তখনও জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ৭৪ রান, হাতে ছিল ১ উইকেট। ক্রিজে ছিলেন পেরেরা ও ফার্নান্দো।

সেট ব্যাটসম্যান পেরেরা আক্রমণাত্মক ভাবে খেলতে থাকেন, অন্য প্রান্ত থেকে তাকে ভাল সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছিলেন ফার্নান্দো। তার ২৭ বলে ৬ রানের ইনিংস ও ১২ চার আর ৫ ছয়ে পেরারা ১৫৩ রানের অপরাজিত ইনিংসে ১ উইকেট হাতে রেখেই জয় তুলে নেয় লঙ্কানরা।

পেরেরা ও ফার্নান্দোর শেষ উইকেটে ৭৮ রানের জুটি, টার্গেটে ব্যাট করে জয় পাওয়া ম্যাচ গুলোর দশম উইকেটের সর্বোচ্চ জুটির রেকর্ড করে। সিরিজের শেষ ম্যাচটিও সফরকারীরা জয় লাভ করে। এতে এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে প্রথম টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় লঙ্কানরা।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More in ক্রিকেট